রোজা রাখার ৭টি অসাধারণ উপকারিতা

image_pdfimage_print

রমজানে রোজা রাখা একজন মানুষকে অনেক দিক দিয়ে আরও শক্তিশালী ও খাঁটি মানুষে পরিনত করে। রমজান মাসে রোজা রাখার ফলে একজন মুসলিম পরকালে নিজের মুক্তির পথ সহজ করার পাশাপাশি, ইহকালেও সফল মানুষ হিসেবে জীবন কাটানোর অনেক গুণ অর্জন করতে পারে।

রমজান মাসে বিশ্বের সব প্রান্তের মুসলিমরা যেন একটি ইউনিটে পরিনত হয়। আজ পর্যন্ত কোনও সমাজ বিজ্ঞানী বা ইতিহাসবিদ বিশ্ব জুড়ে কোনও জাতির এতটা দীর্ঘ সময় ধরে একটি ধর্মীয় আচার একসাথে পালন করার নজির দেখাতে পারেননি। বিশ্বের সকল মুসলিম যে একটি জাতি, আলাদা আলাদা দেশ থাকার পরও যে তারা একটি পরিবার – তা এই রমজান মাসে সবচেয়ে ভালো করে চোখে পড়ে।

রোজা রাখার ১২টি অসাধারণ উপকারিতা

০১. চরিত্রকে শক্তিশালী করা

রমজান রোজা

মানুষের নৈতিক চরিত্রকে শক্তিশালী করার জন্য রোজা রাখা একটি দারুন উপায়। রোজার মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ অনুশীলন হয়, অন্তরকে খাঁটি করা যায়, স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য বাড়ে, এবং মনের মধ্যে স্রষ্টা ও সৃষ্টির জন্য ভালোবাসা বৃদ্ধি হয়।

মজার ব্যাপার হল প্রায় সব ধর্মেই না খেয়ে থাকার ধর্মীয় রীতি আছে। কিন্তু ইসলামের রোজার মত দীর্ঘ সময় ধরে কোনও ধর্মেই এটা নেই। আর সেইসাথে, ইসলামে রোজা মানে শুধুই না খেয়ে থাকা নয়। সব রকমের পার্থিব বিনোদন, এবং যে কোনও ধরনের খারাপ কাজ থেকে যে কোনও মূল্যে বিরত থাকাই রোজা।

দীর্ঘ এক মাস ধরে যদি কেউ এটা ঠিকমত পালন করতে পারে – তবে সে আরও ভালো ও চরিত্রবান মানুষ হয়ে উঠবে। কারণ এটা তার অভ্যাসের অংশ হয়ে যাবে।

০২. আত্ম পর্যালোচনা

রমজান মাস নিজের অবস্থান নিয়ে চিন্তা করার জন্য একটি ভালো সময়। এই সময়ে রোজাদারের মন অনেক নরম অবস্থায় থাকে। এবং সে যদি এই সময়টাতে তার সারা জীবনের ভালো ও খারাপ কাজ গুলো নিয়ে চিন্তা করে – তবে সে নিজের জীবন কোনদিকে যাচ্ছে – তার একটি ভালো ধারণা পাবে। এবং এই ধারনাকে কাজে লাগিয়ে সে নতুন করে নিজের জীবনকে সাজাতে পারবে।

সাধারন সময়ে অনেক সময়েই আমরা জীবন নিয়ে চিন্তা করি, কিন্তু সব সময়ে তা আমাদের মাঝে সঠিক উপলব্ধি ঘটায় না। রোজা থাকা অবস্থায় যদি একজন মানুষ গভীর ভাবে চিন্তা করে যে, সে আসলেই কিভাবে জীবন কাটাচ্ছে, নিজের জন্য এবং অন্যের জন্য কি করছে, সত্যিকার ন্যায়ের পথে চলছে কিনা – তাহলে তার মাঝে এক নতুন উপলব্ধির জন্ম হবে। এর ফলে সে তার জীবনকে নতুন ভাবে সাজাতে পারবে।

০৩. মনে দয়ামায়া বৃদ্ধি করে

রোজার একটি বড় দিক হল, ধনী গরিব – সব মুসলিমই এই সময়ে প্রায় একই অবস্থায় দিন কাটায়। খাবার থাকুক বা না থাকুক – একজন রোজদার খাবার বা পানি স্পর্শ করে না।

এই অবস্থায় একজন ধনী হয়ে জন্মানো মানুষও অভাবের যন্ত্রণা উপলব্ধি করতে পারে। সে যখন রোজা থাকা অবস্থায় অভাবী মানুষের কথা চিন্তা করে – তখন সে আসলেই উপলব্ধি করতে পারে – অভাব কি জিনিস। বুঝতে পারে যারা ঠিকমত খেতে পায় না, তাদের কষ্টটা কিরকম। এর ফলে মানুষের মনে সহানুভূতি ও দয়ার সৃষ্টি হয়। কারণ, আপনি যখন অন্যের কষ্টটা নিজে অনুভব করতে পারবেন – তখনই আপনি পুরোপুরি সহানুভুতিশীল হতে পারবেন। এবং এর ফলে ফলে মানুষের মাঝে নি:স্বার্থ ভাবে অন্যের উপকার করা, এবং আল্লাহ যা তাকে দিয়েছেন – তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার মনোভাব সৃষ্টি হয়।

প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) বলেছেন, ”এই মাস (রমজান) হল গরিব, অসুস্থ, এবং অসহায়দের কাছাকাছি হয়ে তাদের দু:খের অংশীদার হওয়ার মাস। এই মাসে বিশ্বাসী মুসলিমদের খাদ্য ও রোজগার বৃদ্ধি পায়, এবং তারা রহমত প্রাপ্ত হয়।”

ধনী গরিবের সমতা এবং সমাজে সহমর্মীতা ও মায়া মোহাব্বত প্রতিষ্ঠার জন্য রমজান একটি আদর্শ সময়।

০৪.  চিন্তাকে পরিশুদ্ধ করে

রোজা রাখার মাধ্যমে একজন মুসলিম তার স্রষ্টার প্রতি আরও বেশি সচেতন হয়ে ওঠে। অন্য যে কোনও সময়ের চেয়ে এই সময়ে মানুষের মনে আল্লাহর ভয় ও তাঁর প্রতি আনুগত্য বেশি থাকে। এই সময়ে মনে কোনও আজেবাজে চিন্তা এলেও একজন রোজদার সাথে সাথে তা দূর করে দেয়।

সব ধরনের পাপাচার এবং ভোগকে মানুষ তার ইচ্ছাশক্তি ও স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে এড়িয়ে চলে। একজন সত্যিকারের রোজাদার অন্যের ক্ষতি করা তো দূরের কথা, ক্ষতি করার চিন্তাও করতে পারে না। কারণ যখই এই ধরনের কোনও চিন্তা তার মাথায় আসে, তার মনে পড়ে যায় সে রোজা আছে, এবং তার স্রষ্টা তাকে সব সময়ে দেখছেন। এই চিন্তা মাথায় আসার সাথে সাথে মানুষ সব ধরনের খারাপ চিন্তা তার মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে।

এই বিষয়টি দীর্ঘ সময় অনুশীলন করলে একজন মুসলিম রোজার সময় ছাড়া এমনি সময়েও খারাপ চিন্তা থেকে বিরত থাকবে। কারণ এক মাস ধরে এটা প্রাকটিস করতে করতে এটা তার অভ্যাসে পরিনত হয়ে যাবে। তবে এটাকে অভ্যাসে পরিনত করতে হলে সত্যিকার অর্থেই রোজা রাখতে হবে। শুধু না খেয়ে থাকলাম, আর অন্য কোনও প্রকার সংযম করলাম না – এটা সত্যিকার রোজা নয়। সত্যিকার রোজা রাখলে যে কেউ আরও শুদ্ধ মানুষে পরিনত হবে।

০৫. প্রোডাক্টিভ কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়ায়

রোজার সময়ে রোজদার গণ অহেতুক আড্ডা, বেশি কথা বলা, টিভিতে ইচ্ছামত প্রোগ্রাম দেখা, সিনেমা দেখা, গান শোনা – ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে বেশিরভাগ সময় দূরে থাকেন। এই সময়টা মানুষ নফল এবাদত করার পাশাপাশি কোরআন ও ইসলামিক বই পড়া, কোরআন তেলাওয়াত শোনা, ইসলামিক বিষয় নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা – ইত্যাদি কাজ বেশি করে।

এছাড়া এই সময়ে রোজদারগণ অন্যদের দান করা, মানুষের উপকার করার প্রতি মনোযোগী হন – এবং সস্তা বিনোদন এবং অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট করার বদলে ভালো কাজ করার চেষ্টা করেন। যে কোনও ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য এটা অনেক বড় একটি বিষয়।

০৬. একটি স্বাস্থ্যকর দেহ পাওয়াকে সহজ করে

বহু বৈজ্ঞানিক গবেষণাতে দেখা গেছে, রোজা রাখলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থের অনেক গুলো উপকার হয়। রোজার দৈর্ঘ, সময়, এবং পদ্ধতি স্বাস্থ্যের ওপর দারুন ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের হজম শক্তির মাঝে মাঝে বিশ্রাম প্রয়োজন। নির্দিষ্ট সময় ধরে খাবার গ্রহণ না করার ফলে হজম প্রক্রিয়ার কারণে সারা বছর ধরে শরীরে জমা হওয়া টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ শরীর ধ্বংস করতে পারে।

রোজার দৈর্ঘ (১২-১৫ ঘন্টা) আসলে মুখে খাবার নেয়া থেকে শুরু করে খাবারটি পুরোপুরি শরীরে প্রসেস হওযার সাথে মেলানো! অর্থাৎ এই সময়টা না খেয়ে থাকলে আসলে কোনও শারীরিক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাই নেই।

তার বদলে সঠিক ভাবে এক মাস রোজা রাখার ফলে শরীরের বাড়তি চর্বি চলে যায়, হার্টের জটিলতা কমে, ঘুমের গভীরতা বাড়ে, ত্বক মসৃণ হয়, স্মৃতিশক্তি বাড়ে, এবং শরীরের সহ্যক্ষমতা বাড়ে।

০৭. জীবনের চরম সত্য উপলব্ধি করানোর মাধ্যমে আরও ভালো মানুষে পরিনত করবে

রমজান মাসের আমল গুলো ঠিকমত করতে থাকলে আপনি পরকাল বিষয়ে আরও বেশি সচেতন হয়ে উঠবেন। জীবনের চরম সত্য – মৃত্যুর ব্যাপারটা আরও ভালোভাবে স্মরণ করবেন। যার ফলে আপনি পার্থিব জীবনকে আরও ভালো ও অর্থপূর্ণ ভাবে কাটানোর জন্য অনুপ্রাণিত হবেন।

আরও ভালো ও সৎ মানুষ হওয়ার চেষ্টা করবেন সব সময়ে। যা আপনার পার্থিব জীবন ও পরকালকে সফল করবে। একজন সত্যিকার মানুষের মত জীবন কাটাতে পারবেন। কারণ মৃত্যুর চিন্তাই আসলে মানুষকে সঠিক ভাবে জীবন চালাতে অনুপ্রেরণা দেয়।

image_pdfimage_print

Leave a Reply